মৌসুমী বায়ু কে স্থল বায়ু ও সমুদ্র বায়ুর বৃহৎ সংস্করণ বলা হয় কেন?

মৌসুমী বায়ু কে স্থল বায়ু ও সমুদ্র বায়ুর বৃহৎ সংস্করণ বলা হয় কেন?

ভারত এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশ গুলির উপর দিয়ে প্রবাহিত মৌসুমী বায়ু কে স্থল বায়ু ও সমুদ্র বায়ুর বৃহৎ সংস্করণ বলা হয় কেন – সেই সম্পর্কে এখানে আলোচনা করা হলো। 

ভারতীয় ভূখণ্ডের উপর দিয়ে প্রবাহিত মৌসুমী বায়ু স্থল বায়ু ও সমুদ্র বায়ুর মতো এক প্রকার সাময়িক বায়ু। কারণ স্থল বায়ু ও সমুদ্র বায়ু যেমন দিন ও রাতের একটি নির্দিষ্ট সময়ে প্রবাহিত হয় অন্য সময় এদের প্রবাহ তেমন একটা লক্ষ্য করা যায় না ঠিক তেমনি মৌসুমী বায়ুও বছরের একটি নির্দিষ্ট ঋতুতেই প্রবাহিত হয় বছরের অন্য সময় মৌসুমী বায়ুর প্রভাব দেখা যায় না। প্রবাহ গত দিক থেকে মৌসুমী বায়ু এবং স্থল ও সমুদ্র বায়ুর মধ্যে যেমন মিল দেখা যায় তেমনি এই দুই প্রকার বায়ুর মধ্যে উৎপত্তি গত দিক দিয়েও সাদৃশ্য চোখে পড়ে। এই সম্পর্কে নিম্নে আলোচনা করা হলো। 

স্থল বায়ু ও সমুদ্র বায়ু সৃষ্টির মূল কারণ হল দিন ও রাতের উষ্ণতার তারতম্য জনিত কারণে সৃষ্ট চাপ ঢালের পার্থক্য। যেমন – দিনের বেলায় প্রখর সূর্য কিরণ জনিত কারণে স্থল ভাগ যে পরিমাণ উত্তপ্ত হতে পারে জলভাগ পারে না বলে স্থলভাগের উপর নিম্ন চাপ আর জলভাগের উপর উচ্চ চাপ বিরাজ করে। যার দরুন জলভাগ বা সমুদ্রের উচ্চ চাপ অঞ্চল থেকে স্থল ভাগের নিম্ন চাপ অঞ্চলের দিকে বিকেল ও সন্ধ্যার দিকে (এই সময় চাপ ঢালের পার্থক্য সবচেয়ে বেশি হয়) সমুদ্র বায়ুর প্রভাব দেখা যায়। 

আবার রাতের বেলা স্থল ভাগ দ্রুত তাপ বিকিরণ করে যে পরিমাণ শীতল হতে পারে জলভাগ বা সমুদ্র পারে না বলে সমুদ্র পৃষ্ঠের উষ্ণতা স্থলভাগের চেয়ে বেশি হয়। তাই এই সময় জলভাগের উপর নিম্নচাপ আর স্থল ভাগের উপর উচ্চ চাপ বিরাজ করে। ফল স্বরূপ ভোরের দিকে (এই সময় চাপ ঢালের পার্থক্য সবচেয়ে বেশি হয়) স্থলভাগ থেকে সমুদ্রের দিকে স্থলবায়ুর প্রবাহ দেখা যায়। 

সুতরাং দেখা যাচ্ছে স্থল বায়ু ও সমুদ্র বায়ু সৃষ্টির মূল কারণ হল স্থলভাগ ও জলভাগের মধ্যে উষ্ণতার পার্থক্য। 

ঠিক একই ভাবে মৌসুমী বায়ু সৃষ্টির পিছনে রয়েছে স্থল ভাগ ও সমুদ্রের মধ্যে উষ্ণতার তারতম্য জনিত চাপ ঢালের পার্থক্য। মূলত জুন জুলাই মাসে মৌসুমী বায়ুর প্রবাহ লক্ষ্য করা যায়। এই সময় উত্তর গোলার্ধে গ্রীষ্মকাল বিরাজ করে। তাই ভারতীয় উপমহাদেশের স্থলীয় অংশে প্রখর উষ্ণতার কারণে প্রবল নিম্ন চাপের সৃষ্টি হয় কিন্তু ভারত মহাসাগরের জল ভাগ সেই তুলনায় কম উষ্ণ হয় বলে, এই অংশে উচ্চচাপ অবস্থান করে। অর্থাৎ গ্রীষ্ম কালে জল ভাগের উচ্চ চাপ অঞ্চল থেকে ভারতীয় স্থলভাগের নিম্ন চাপ অঞ্চলের দিকে দক্ষিণ পশ্চিম দিকে থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বায়ুর প্রবাহ দেখা যায়। আবার শীত কালে ঠিক এর বিপরীত অবস্থা দেখা যায়, যেমন – এই সময় ভারতীয় ভূখন্ডে শীত কাল বিরাজ করায় ভারতীয় স্থল ভাগ দ্রুত তাপ বিকিরণ করে শীতল হয়ে পড়ে বলে, এই সময় স্থল ভাগের উপর উচ্চ চাপ অন্য দিকে ভারত মহাসাগরীয় অংশ তেমন একটা শীতল হয় না বলে জল ভাগের উপর উচ্চচাপ অবস্থান করে। ফলে শীত কালে ভারতীয় স্থল ভাগে উচ্চচাপ অঞ্চল থেকে সমুদ্রের নিম্ন চাপ অঞ্চলের দিকে উত্তর পূর্ব দিক থেকে শীতল ও শুষ্ক উত্তর-পূর্ব মৌসুমী বায়ুর প্রবাহ দেখা যায়। এই কারণে মৌসুমী বায়ু কে স্থল বায়ু ও সমুদ্র বায়ুর বৃহৎ সংস্করণ বলা হয়। 

স্থল বায়ু ও সমুদ্র বায়ুর সঙ্গে মৌসুমী বায়ুর কিছু সাদৃশ্য নিম্নে তুলে ধরা হলো। 

1) স্থল বায়ু ও সমুদ্র বায়ুর মতো মৌসুমী বায়ু ও এক প্রকার সাময়িক বায়ু। 

2) স্থল বায়ু ও সমুদ্র বায়ু এবং মৌসুমী বায়ুর সৃষ্টির মূল কারণ হল স্থল ও জল ভাগের মধ্যে উষ্ণতার তারতম্য।

3) সমুদ্র বায়ু আর্দ্র ও স্থল বায়ু শুষ্ক প্রকৃতির ঠিক তেমনি দক্ষিণ পশ্চিম মৌসুমী বায়ু উষ্ণ ও আর্দ্র এবং উত্তর পূর্ব মৌসুমী বায়ু শীতল ও শুষ্ক। 

4) স্থল ও সমুদ্র বায়ু যেমন রাত ও দিনে প্রবাহিত হয় ঠিক তেমনি দক্ষিণ পশ্চিম ও উত্তর পূর্ব মৌসুমী বায়ু গ্রীষ্ম ও শীত কালে প্রবাহিত হয়। 

Leave a Comment